পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী বাণিজ্য নগরী কলকাতার যে কয়েকটি স্থাপত্য ভাস্কর্যের কথা মাথায় আসে, তার মধ্যে প্রথম নামটি অবধারিত ভাবে হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা হাওড়া ব্রীজ। আমাদের এই প্রতিবেদনটি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এর ওপর এই স্মৃতিসৌধটি রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিরক্ষার্থে তৈরি। কিন্তু এর পিছনেও লুকিয়ে রয়েছে অনেক না জানা কথা যা এই প্রতিবেদনের উপজীব্য।
বর্তমানে যেখানে রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিসৌধটি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে কয়েক দশক আগেও ছিল দাগী আসামীদের কারাগার ? অবাক হলেও এটাই বাস্তব!
১৭৬৭ সালে কলকাতায় দুটি মাত্র জেলখানা ছিল, একটি ছিল লালবাজারে এবং অপরটি বড়বাজারে। একটি ছিল Petty Crime বা লঘু অপরাধের জন্য, অপরটি Serious Crime বা ঘৃণ্য অপরাধের জন্য। তখন ইংরেজ শাসকরা যে হারে যথেচ্ছ ধরপাকড় করতেন তাতে জেলের জায়গা সংকুলান হয়ে পড়ায় ১৭৭৮ সালে প্রেসিডেন্সি জেল তৈরি করা হয়, যেখানে এখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। স্থানীয় লোকেদের কাছে এই জায়গাটি ‘হরিণবাড়ি’ নামে পরিচিত। কথিত আছে এখানে নবাব সিরাজ-উদ্-দৌল্লা হরিণ শিকার করতে আসতেন। এই জেলটি উচ্চ শ্রেণীর কয়েদিদের জন্য ব্যবহার করা হত। এই জেলে কয়েদিদের সাথে তাদের বাড়ির লোকের থাকারও বন্দোবস্ত ছিল। এই জেলের অন্যতম একজন কয়েদি ছিলেন ‘বেঙ্গল গেজেট’ পত্রিকার জনক জেমস অগাস্টাস হিকি। পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্সি জেল ১৯০৬ সালে আলিপুরে স্থানান্তরিত করা হয় এবং প্রেসিডেন্সি জেল ভেঙে রানীর স্মৃতিসৌধকে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়।
১৯০৬ সালে ওয়েলস এর রাজকুমার এই স্মৃতি সৌধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯০১ সালে রানীর অন্তর্ধানের পর ঠিক হয় সারা ভারত জুড়ে রানীর স্মৃতি রক্ষার্থে ছোট ছোট সৌধ নির্মাণ করা হবে। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন স্থির করেন কলকাতার বুকে একটি সুবিশাল স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করবেন যা হার মানাবে তাজমহলের ঔজ্জ্বল্য আর স্থাপত্যশৈলীকে।
স্থাপত্য কাজের দায়িত্ব বর্তায় ‘ Royal Institute of British Architect’ এর সভাপতি উইলিয়াম এমারসন এর ওপর এবং নির্মাণ কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় কলকাতা ভিত্তিক কোম্পানি ‘ মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি’ এর ওপর। সুদূর রাজস্থান থেকে ২০০,০০০ ঘনফুট মাক্রানা মার্বেল নিয়ে আসা হয়, যেই মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছিল তাজমহল তৈরিতে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার সৌধটি তৈরিতে প্রয়োজন প্রায় ৭৬ লাখ টাকা তোলা হয়েছিল ভারতের সাধারন জনগনের পকেট থেকে। এর থেকে বোঝা যায় সেই সময় ইংরেজরা কিভাবে ভারতের সাধারন মানুষদের লুঠ করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বিভিন্ন ইংরেজ প্রশাসকদের মূর্তি সরিয়ে সেই স্থানে ভারতীয় বিখ্যাত ব্যক্তিদের মূর্তি বসানো শুরু হয়। সেই সব মূর্তির বেশিরভাগ স্থান পায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জেমস আউটরামের মূর্তি, যেটি পূর্বে পার্কস্ট্রীট ও চৌরঙ্গী ক্রসিং-এ শোভা পেত। ১৯৫৮ সালে সেই জায়গায় স্থান পায় মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি।

Users Today : 4
Users Yesterday : 25
Users Last 30 days : 1068
Users This Year : 7900
Total Users : 45484
Views Last 30 days : 1609
Total views : 104372
Who's Online : 0
